Logo
 

বুধবার,১৬ই জানুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৪ঠা মাঘ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৯শে রবিউস-সানি, ১৪৩৯ হিজরী

 
 

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ ধোঁয়াশাপূর্ণ-বিভ্রান্তিকর: মির্জা আলমগীর

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতকাল সন্ধ্যায় দেয়া জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণকে ‘খুবই অস্পষ্ট, ধোঁয়াশাপূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

মির্জা ফখরুল বলেছেন, তাঁর ভাষণ জাতিকে হতাশ, বিস্ময়-বিমূঢ় এবং উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এই ভাষণে বিদ্যমান জাতীয় সঙ্কট নিরসনে স্পষ্ট কোনও রূপরেখা নেই। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন তা খুবই অস্পষ্ট, ধোঁয়াশাপূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর ।

শনিবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ সব কথা বলেন। গতকাল সন্ধ্যায় দেয়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে বিএনপির পক্ষ থেকে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

এ সময় বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘জাতি আশা করেছিল তার প্রধানমন্ত্রিত্বের এই মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার এক বছর আগেই তিনি যে ভাষণ দেবেন সে ভাষণে থাকবে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা, জাতীয় সংকট নিরসনে একটি স্পষ্ট রূপরেখা এবং জনগণের উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা দূর করার জন্য থাকবে বিভ্রান্তির বেড়াজালমুক্ত কর্ম পদক্ষেপ।’

ফখরুল বলেন, ‘পাকিস্তানের স্বৈর-সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান তাঁর শাসনের দশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে জাঁকজমকপূর্ণভাবে উন্নয়ন দশক (Decade of Development) পালন করেছিলেন। গণতন্ত্রহীন তথাকথিত উন্নয়ন জনগণ গ্রহণ করেনি। পরিণতিতে তাঁর মত ‘লৌহমানব’কে ক্ষমতা থেকে সমস্ত পাকিস্তানব্যাপী গণঅভ্য্ত্থুানের মুখে বিদায় নিতে হয়েছিল। বর্তমান সরকারও ‘উন্নয়নমেলা ’ করছে।’

‘ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস পাকিস্তানী আমলের স্বৈরশাসক ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার জন্য যে ধরনের চমকের আশ্রয় নিয়েছিলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারও সেই একই পথে হাঁটছে। এ দেশের সচেতন জনগণ সবকিছু জানে ও বোঝে। সুতরাং এ ব্যাপারে আমাদের কোনও মন্তব্য বাহুল্যই হবে মাত্র।’
লিখিত বক্তব্যে ফখরুল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে তাঁর শাসনামলে উন্নয়নের এক চোখ ধাঁধাঁনো বয়ান পেশ করেছেন। বিশেষ করে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে তাঁদের দাবির সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের মত প্রতিষ্ঠানও একমত হতে পারেনি।’

‘জানুয়ারি / ২০১৭ এর বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস থেকে জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৩ শতাংশের বেশি হবে না। অথচ অর্থমন্ত্রী দাবি করেছিলেন এই প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে হবে না। অন্যদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য সরকারের জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭.২ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে বিশ্বব্যাংক মনে করে। অথচ সরকার এ অর্থবছরে ৭.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে। এ ভাবে প্রায় প্রতি বছরই প্রবৃদ্ধি সংক্রান্ত সরকারি প্রাক্কলেনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাগুলো দ্বিমত পোষণ করে আসছে।’ -বলছিলেন ফখরুল।

তার ভাষায়, ‘আমাদের প্রশ্ন হলো, জনগণ কোন তথ্য বিশ্বাস করবে? অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, প্রবৃদ্ধির হারের সঙ্গে অন্যান্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের একটি সহসম্পর্ক থাকার কথা। কিন্তু আমদানি- রপ্তানি, বৈদেশিক র‌্যামিট্যান্স, ঋণ প্রবাহ প্রভৃতির সঙ্গে সরকারের প্রবৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রাক্কলনের সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় না। পরিসংখ্যানের তেলেসমাতি করে সরকার বরাবরই জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। প্রধানমন্ত্রীও তাই করলেন।’

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি শ্লথ হয়ে গিয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের উপাত্ত অনুযায়ী- ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ে দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বার্ষিক হার ৩.১ শতাংশ হলেও ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বার্ষিক হার ১.৮ শতাংশে নেমে আসে। যা অর্থনীতিতে সুযোগের সমতা নিশ্চিত করণ ও সুবিধাবঞ্চিতদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রবৃদ্ধির ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ফখরুল বলেন, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির হার ও নি¤œ আয়ের মানুষদের দৈনন্দিন জীবিকা নির্বাহের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যে কারণে ২০১৭ সালের মে মাস থেকে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। গড় সাধারণ মূল্যস্ফীতি অক্টোবর মাসে সর্বোচ্চ ৫.৫৯ শতাংশ হয়। এদিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও বৃদ্ধি পেয়ে অক্টোবর মাসে সর্বোচ্চ ৬.৮৯ শতাংশে উন্নীত হয় যদিও খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সেপ্টেম্বর মাসের ৩.৮১ শতাংশ থেকে কিছুটা হ্রাস পেয়ে ৩.৬৫ শতাংশ হয়। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদন হ্রাস, প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ার প্রবণতা ও কর্মসংস্থানের অভাব একদিকে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মানের উপর প্রতিকূল প্রভাব সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে দেশের সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির সম্মুখীন করছে।

‘বর্তমান সরকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাদের উন্নয়নের বয়ানকে দৃশ্যমান করার জন্য কোশেস করছে। মেগা-প্রকল্পগুলো নিয়ে গণমাধ্যম ইতোমধ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করছে। এ সব প্রকল্পের ব্যয় ভারত, চীন ও ইউরোপের দেশগুলোর তুলনায় দুই থেকে তিন গুন বেশি। সঠিক সময়ে প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়িত না হওয়ায় একাধিকবার প্রকল্প-ব্যয় উধর্¦মুখী সংশোধন করতে হচ্ছে । ফলে এ সব প্রকল্প থেকে কাংখিত কল্যান সুদূরপরাহত হয়ে পড়েছে।’

বাংলাদেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছে উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, একটি জাতীয় দৈনিকের হিসেব অনুযায়ী মার্চ ২০১৭ শেষে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৭৩ হাজার ৪ শত ৯ কোটি টাকা, যা ব্যাংকের মোট ঋণের ১০.৫৩%। ২০১৬ মার্চে খেলাপি ঋণ ছিল ৫৯ হাজার ৪ শত ১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে আরও ৪৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। যার মাধ্যমে এসব মন্দ ঋণ আর্থিক প্রতিবেদন থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। এ তথ্য খেলাপির হিসাবে নিলে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। হিসাবটি আঁতকে ওঠার মতো। ২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি টিম সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক গ্রুপ অবৈধভাবে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়ার জালিয়াতি শনাক্ত করে। এরপর একে একে বিসমিল্লাহ গ্রুপ, ডেসটিনি গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি এবং বেসিক ব্যাংকসহ দেশের অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতি ও জনগণের অর্থ লোপাটের লোমহর্ষক খবর দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকে।

‘দেশের মানুষের রক্ত চুষে হাজার কোটি টাকা বিদেশে প্রেরণ করার ফলে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ কমে এসেছে’ দাবি করে ফখরুল বলেন, মানুষ নি:স্ব হচ্ছে আর বেকার সমস্যা বাড়ছে। মানুষের মৌলিক অধিকার লুন্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু টাকা পাচার রোধে দৃশ্যত সরকারের কোন রাজনৈতিক সদিচ্ছা নাই। কারণ দেশের ভেতর বিভিন্ন ভাবে লুটপাট করে অবৈধভাবে অর্জিত এসব টাকা বিদেশে পাচার করার সাথে যারা জড়িত তাদের অধিকাংশই আওয়ামী ঘরানার লোক বা আওয়ামী সরকারের মদদপুষ্ট।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “সংবিধান অনুযায়ী ২০১৮ সালের শেষদিকে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কীভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তা আমাদের সংবিধানে সম্পূর্ণভাবে বলা আছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার সর্বতোভাবে নির্বাচন কমিশনারকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে যাবে”।

এ প্রসঙ্গে ফখরুল বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য নির্বাচনকে ঘিরে বিদ্যমান সংকটকে আরো ঘনীভূত করে তুলেছে। সংবিধানে “নির্বাচনকালীন সরকার” সম্পর্কে স্পষ্ট কোন বিধান নেই। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী যদি সংসদ বহাল রেখে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তা হলে সেই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না। কারণ সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় নির্বাচনকালীন সরকারও হবে বিদ্যমান সরকারেরই অনুরুপ। সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকার কেবল রুটিন ওয়ার্ক করবে- এমন কিছু উল্লেখ নেই। সংবিধানের ১৫তম ও ১৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের শাসনকে পাকাপোক্ত করার একটি ব্যবস্থাই করা হয়েছে মাত্র। সংবিধান ও গণতন্ত্র সবসময় সমার্থক বা সমান্তরাল হয় না। তাই যদি হতো তা হলে হিটলার ও মুসোলিনির শাসনকেও গণতান্ত্রিক বলা যেত। কারণ তাদের শাসনও সংবিধান অনুযায়ীই ছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী যদি আন্তরিকভাবে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে নতুন কিছু ভেবে থাকেন তা হলে তাঁর উচিত হবে এ নিয়ে সকল স্টেক-হোল্ডারদের সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নেয়া। আমাদের দল মনে করে, একটি আন্তরিক ও হৃদ্যতপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে ২০১৮’র নির্বাচন সম্পর্কে অর্থবহ সমাধানে আসা সম্ভব। নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা কেমন হতে পারে, তা নিয়ে আমাদের দলের একটি চিন্তা-ভাবনা আছে।

‘একটি সুন্দর পরিবেশে সংলাপটি অনুষ্ঠিত হলে জাতির মনে যে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আমরা আস্থা রাখতে চাই,’ – যোগ করেন বিএনপি মহাসচিব।

আজকে

  • ৪ঠা মাঘ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
  • ১৬ই জানুয়ারি, ২০১৮ ইং
  • ২৯শে রবিউস-সানি, ১৪৩৯ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

 

Express News

 
 
 
সম্পাদক: এম.এ.জাহান, চেয়ারম্যান: ছিদ্দিকুর রহমান (ছিদ্দিক), উপদেষ্টা: আব্দুল বাছিদ আছিদ, পৃষ্ঠপোষক: আব্দুল জলিল ভূইয়া
রিপোর্টার: মোঃ জিয়াউর রহমান, রাসেল আহাম্মেদ, হারুনুর রশিদ হারুন, শুকুর আলী, সহ রিপোর্টার: নুরুল ইসলাম,রহিম,হিরু,মতিন।
ই-মেইল: expressnews@gmail.com
ই-মেইল: info@expressnews.com